ঐতিহ্যবাহী ও একদিনের সবচেয়ে বড় বগুড়ার গাবতলীতে চার শো বছরের পুরানো ঐতিহ্যবাহী পোড়াদহের মেলা কাল বুধবার । এ মেলার প্রধান আকর্ষণ বিভিন্ন প্রজাতির বিশাল আকৃতির মাছ ও বাহারী রসালো মিষ্টি। দুই শতাধিক বিঘা জমিতে বসেছে এ মেলায় একদিনে কয়েক কোটি টাকার বিক্রি হয়ে থাকে। কিন্তু মেলার দিন আসার আগেই আজ মঙ্গলবার সকাল থেকে চালানো হচ্ছে জুয়া। এসব জুয়া ও অশ্লীল নৃত্য বিহীন মেলা চায় না এলাকাবাসী।
এবারের মেলায় গত বছর সবচেয়ে বড় সাইজের ব্লাক কার্প মাছের ওজন ৪০ কেজি। প্রতি কেজি ২ হাজার টাকা হিসেবে মাছটির দাম হাঁকা হয়েছে ৮০ হাজার টাকা। এটি মাছের মেলা হিসেবেও অনেকের কাছে পরিচিত। এখান থেকে মাছ কিনে শ্বশুরবাড়ি নিয়ে যান মেয়ের জামাইরা। মেলা উপলক্ষে বাড়িতে বাড়িতে চলছে অতিথি আপ্যায়ন ও আনন্দ উৎসব। অতীতের একদিনের মেলা হলেও বৃহস্পতিবার বসবে বৌ মেলা। এ মেলায় ক্রেতা শুধুমাত্র মেয়েরা।
পোড়াদহ উপলক্ষে অত্রএলাকার গ্রামগুলোতে জামাই মেয়েদের দাওয়াত করে এনেছেন। সেজন্য মেলার জন্য গ্রামগুলোতে নানা আত্মীয় স্বজনদের উপস্থিতি জমজমাট।
স্থানীয়রা জানান, মেলা উপলক্ষে পোড়াদহের আশেপাশের সব গ্রামে উৎসবের ধুম লেগে যায়। প্রত্যেক বাড়ির জামাইদের দাওয়াত করা হয়। এ ছাড়াও অন্য আত্মীয় স্বজনদের দাওয়াত করে আপ্যায়ন করান স্থানীয়রা।
বগুড়া জেলার গাবতলী উপজেলার পূর্বে ইছামতির তীরে পোড়াদহ এলাকায় এ মেলা বসে। ফলে মেলাটি সবার কাছে পোড়াদহ’ মেলা নামেই সর্বাধিক পরিচিত। প্রায় দুইশো বছর আগের ঘটনা। মেলাস্থলে ছিলো একটি বিশাল বটবৃক্ষ। সেখানে একদিন হঠাৎ এক সন্ন্যাসীর আবির্ভাব ঘটে। পরে সেখানে আশ্রম তৈরি করেন সন্ন্যাসীরা। একপর্যায়ে স্থানটি পূণ্যস্থানে পরিণত হয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে।
প্রতিবছর মাঘের শেষ বুধবার উক্ত স্থানে সন্ন্যাসী পূজার আয়োজন করে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন। সমাগত হন দূর-দূরান্তের ভক্তরা। কালের আবর্তে স্থানটিতে লোকজনের উপস্থিতি বাড়তেই থাকে। এভাবে গোড়াপত্তন ঘটে পোড়াদহ মেলার। ধর্মের গন্ডি পেরিয়ে সব ধর্মের মানুষের মেলবন্ধনে পরিণত হয়েছে এই মেলা। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যবসায়ীগণ এ মেলায় এসে তাদের না পুন্যর পসরা বসিয়েছেন।
গাবতলী উপজেলার মহিষাবান এলাকার আব্দুল হামিদ ও গিয়াস উদ্দিন জানান, মেলা উপলক্ষে তার মেয়ে এবং জামাইসহ নাতি-নাতনিরা এসেছেন।
এ মেলায় আরেক বড় আকর্ষণ মাছের আকৃতির ছোট বড় সাইজের প্রায় বিশ রকমের মিষ্টি বিক্রি হয়। কাতল মাছের আকৃতির ১১ কেজি ওজনের মিষ্টি গত মেলায় সবার নজর কেড়েছে। প্রতি কেজি ৪০০ টাকা হিসেবে ওই মিষ্টির দাম চাওয়া হয়েছিল ৪ হাজার ৪০০ টাকা। এছাড়া কুল (বরই) এবং কেশরসহ নানা স্বাদের ফলও উঠেছে মেলায়। এমনকি বিভিন্ন ধরণের ফার্নিচারসহ নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও ছিল চোখে পরার মত।
এলাকার আজাহার আলী জানান, পোড়াদহ মেলার শুরুর আগে থেকেই জুয়া বাসানো হয়েছে। এসব জুয়াতে সাধারণ মানুষ সর্বশান্ত হয়ে যাবে। তাই জুয়া ও অশ্লীল নৃত্য বিহীন মেলা দেখতে চায় এলাকার জনসাধারণ।
পোড়াদহ মেলা আয়োজক কমিটির প্রধান মহিষাবান ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ বলেন, এবারের মেলায় প্রায় দুই হাজারেও বেশি দোকান বসেছে। এর মধ্যে মাছের দোকানই চার শতাধিক। এসব দোকানে কয়েক কোটি টাকার মিষ্টি ও মাছ কেনা বেচার টার্গেট করা হয়েছে। মেলায় কোন জুয়া, অশ্লীল কাজ চলবে না।
গাবতলী মডেল থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কমকতা( ওসি) আশিক ইকবাল জানান, ঐতিহ্যবাহী পোড়দহ মেলা সুষ্ঠ ও শান্তিপূনভাবে করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহন করা হয়েছে। মেলা প্রাঙ্গনে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হবে।
বগুড়া পুলিশ সুপার জেদান আল মুসা পিপিএম জানান, বগুড়ার ঐতিহ্য বাহি পোড়াদহ মেলা সুষ্ঠ ও শান্তি পুর্ন করতে পুলিশ বদ্ধপরিকর। পুলিশের পাশাপাশি র্যাব সদস্যগন টহল দেবে এবং আরও অন্যান্য আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা নজর রাখবে। মেলায় কোন জুয়া এবং কোন অশ্লীল কার্যকলাপ হতে দেওয়া হবে না।
Leave a Reply