নিজস্ব প্রতিবেদক
শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কারের আন্দোলন চলাকালে ঢাকার সাভারে পুলিশের গুলিতে গত শনিবার(২০ জুলাই) মারা যান রিকশাচালক বগুড়ার রনি প্রামাণিক (২৫) । নিহত রনির বাড়ি বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার পঞ্চদাস গ্রামের স্বজনদের শোকের মাতামে এলাকার আকাশ বাতাস ভারি হয়ে আছে। নিহত রনির দুই শিশু স্ত্রী তার স্বামীকে এবং একমাত্র মা তার সন্তানকে হারিয়ে চরম অসহায়ত্ব বোধ করছে । নিহত রনি উপজেলার বুড়িগঞ্জ ইউনিয়নের পঞ্চদাস লোলখুর গ্রামের মৃত দিলবর প্রামাণিকের ছেলে। গত এক সপ্তাহে সরকার বা কোন প্রতিষ্ঠান হতদরিদ্র পরিবারের পাশে কেউ না দাড়ালেও এ নিয়ে বগুড়াপোস্ট’র প্রকাশিত সংবাদ দেখে শনিবার বিকেলে বগুড়া তরুন সমাজ সেবক মাহবুবুর রহমান ছোটন এক মাসের খাদ্য সামগ্রী প্রদান করেছেন।
২৭ জুলাই শনিবার বিকেলে বগুড়া শহর থেকে সিএনজি অটোরিকশা রিজার্ভ করে গুলিতে রিকশা চালক রণির বাড়িতে ছেলে হারিয়ে শোকাহত হতদরিদ্র পরিবারের কাছে এক মাস চলার মতো খাবার সামগ্রী বগুড়ার মানবিক সমাজসেবক মাহবুবুর রহমান ছোটনের প্রদত্ত প্রদান করা হয়েছে। খাবার সামগ্রীর মধ্যে ছিল এক বস্তাচাল, ডাল,ডিম,তেল, আলু, কুমড়াসহ তরিতরকারি। এসময় উপস্থিত ছিলেন বাংলা ভিশন এর বগুড়া ব্যুরো চীফ ইতিহাসবিদ আব্দুর রহিম বগরা, ইংরেজি পত্রিকা দ্যা ডেইলি ম্যাসেঞ্জারের বগুড়া ব্যুরো চীফ আলমগীর হোসেন, স্থানীয় মাজিহট্ট ইউনিয়নে সমাজসেবক শেখ মোহাম্মদ বেলাল, স্থানীয় বাদলসহ পুকুরপাড়ের বাসিন্দাগণ।
এসময় মাহবুবুর রহমান ছোটন নিহত রনির মাকে মোবাইলে বলেন, আপনাকে ( শাহানা ) টিন দিয়ে ঘর করে দেওয়ার ব্যবস্থা করবো এবং আগামী ডিসেম্বরে একটি বকনা বাছুর দেব। এই বাকনা বাছুর লালন পালন করে জীবনে একটু হলেও স্বাবলম্বি হয়ে স্বস্থিতে জীবন যাপন করবেন।
এসব খাদ্য সামগ্রী নিহত রণির মা ও তার স্ত্রী পেয়ে কিছুটা স্বস্থিতে তারা মানবতার অগ্রদুধ বিশিষ্ট সমাজসেবক মাহবুবুর রহমান ছোটনের জন্য দোয়া করেন । রণি মা শাহানা বলেন, আল্লাহ তায়ালা মাহবুবুর রহমান ছোটনকে যেন ভালো রাখে এবং মানুষকে আরও সহযোগিতা প্রদানের সামর্থ দান করুন।
জানা যায়, শিবগঞ্জ বুড়িগঞ্জ ইউনিয়নের পঞ্চদাস লোলখুর গ্রামের পুকুরপাড়ের ভুমিহীন মৃত দিলবর প্রামাণিকের ছেলে রণি প্রামানিক জীবন জীবিকার জন্য রিকশা চালানোর জন্য ঢাকার সাভারে যান। স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে সাভার বাসষ্ট্যান্ড এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস করে আসছিলেন নিহত রনি। গত শনিবার রণির শরীর খারাপ থাকার কারণে ৯টায় গ্যারেজ থেকে রিকশা নিয়ে বের হয়। এরপর বেলা ১১টার সাভার বাসষ্ট্যান্ডে যাত্রীর জন্য অপেক্ষা করতেই হঠাৎ আন্দোলনকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশের ছোড়া গুলিবিদ্ধ হয় রিকশা চালক রণি। স্থায়ীরা তাকে উদ্ধার করে এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। সেই নিহত রনি প্রামানিককের মরদেহ বগুড়ায় গ্রামের বাড়িতে আসে রোববার সকালে। সেখানে ছেলের মরদেহ দেখে রনির বিধবা মা শাহানা খাতুন অজ্ঞাত হয়ে যায়। নিহত রণির দুই শিশু সন্তান শুধু বাবাকে খুঁজে ফিরছে ছোট্ট দুটি চোখ। সে জানে না, তার বাবা আর কখনও ফিরবে না। দেড় বছর বয়সী ইভানের কান্না দেখে প্রতিবশীরাও চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। স্ত্রী সাথী বেগম দুই শিশুসন্তান নিয়ে দিশেহারা। রনি প্রামানিক ও সাথী বেগমের দম্পতির বড় ছেলে ইয়াসিনের বয়স পাঁচ বছর ও ছোট ছেলে ইভানের বয়স দেড় বছর।
পঞ্চদাস গ্রামের বাসিন্দা আজিজার রহমান জানান, গত রোববার ভোরে সন্তানসহ স্বামীর মরদেহ নিয়ে সাথী বেগম গ্রামের বাড়িতে বগুড়া আসেন। বাদ জোহর জানাজা শেষে স্থানীয়ভাবে তাঁর মরদেহ দাফন করা হয়। রনির দিনমজুর বাবা ৪ বছর আগে মারা গেছেন। মা শাহানা খাতুন খাস জমিতে ঝুপড়ি ঘর তুলে বসবাস করছেন। মানুষের দান-দক্ষিণায় চলে তাঁর জীবিকা।
সরেজমিন দেখা যায়, সন্তানের মরদেহের পাশে বসে রনির মা শাহানা খাতুন বিলাপ করছেন আর বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। জ্ঞান ফিরতেই বলেন, ‘হ্যামার বুকের ধন ছোলক পাখির মতোন গুলি কর্যার মারছে। হামি এখন কী নিয়া ক্যানকা করে বাঁচমু।
এ সময় রনির স্ত্রী সাথী বেগম জানান, ছোট ছেলে জ্বরে ভুগছিল। ওর বাবার শরীরও ভালো যাচ্ছিল না। কিন্তু গত দুদিন রিকশা বন্ধ থাকায় ঘরে চাল-ডাল ছিল না।সন্তানের জন্য ওষুধ কেনাও দরকার। এ জন্য শনিবার সকাল ৯টার দিকে গ্যারেজ মহাজনের কাছ থেকে রিকশা নিয়ে বের হয়। দুপুর ১২টার দিকে এক প্রতিবেশী ফোন করে জানান, তোমার স্বামীর বুকে গুলি লেগেছে, এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আছে। সঙ্গে সঙ্গে ইভানকে কোলে নিয়ে হাসপাতালে গিয়ে স্বামীর নিথর দেহ পড়ে থাকতে পাই। তাঁর বুকেপিঠে অসংখ্য গুলির চিহ্ন।
তিনি বলেন, আমার স্বামী তো আন্দোলন করেনি। তার পরও তাঁকে জীবন দিতে হলো। ছেলেরা বাবা বাবা বলে হয়রানি হচ্ছে। ইভান বাবার জন্য পাগল ছিল। ওকে থামাতে পারছি না। শুধুই বাবাকে খুঁজছে, বুকের দুধও খাচ্ছে না। আমি অবুঝ সন্তানদের কী বুঝ দেব, এক বেলা খাওয়ার মতো ঘরে চাল-ডালও নেই। ওদের কীভাবে বড় করব, বুঝে উঠতে পারছি না।
নিহতের মা শাহানা খাতুন জানান, আমার বেঁচে থাকার কোন কিছু নেই। একমাত্র নিরিহ সন্তানকে অন্যায়ভাবে মেরে ফেলল। এখন আমি কাকে নিয়ে বাচব। কার আশায় থাকব। আমার ছেলের শিশু সন্তানদের কি হবে, কেমন করে কি খাওয়াব, কি করে তারা বাচবে।
caller_get_posts is deprecated. Use ignore_sticky_posts instead. in /home/bogurapo/public_html/wp-includes/functions.php on line 6260caller_get_posts is deprecated. Use ignore_sticky_posts instead. in /home/bogurapo/public_html/wp-includes/functions.php on line 6260
Leave a Reply