আতিকুর রহমান, ঝালকাঠি
বাংলাদেশের দক্ষিণে উপকূলীয় জেলা ঝালকাঠির ভীমরুলী গ্রাম। সদর উপজেলার উত্তরদিকে অবস্থান গ্রামটির। পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি, বরিশালের বানারীপাড়া এবং ঝালকাঠি সদর উপজেলার সীমান্তবর্তি এ গ্রামটিতে প্রতিদিন কয়েক লাখ টাকার পেয়ারা ক্রয়-বিক্রয় হয়। ভীমরুলী গ্রামে ভাসমান জলবাজারের প্রধান পণ্য পেয়ারা। সারি সারি নৌকার ওপর কাঁচা-পাকা সবুজ-হলুদ পেয়ারা। হাটুরেদের হাঁকডাকে গম গম করে পুরো এলাকা।
স্থানীয়দের কাছে জানা গেল, এ অঞ্চলের ‘সবচেয়ে বড়’ ভাসমান হাট এটি, যা পুরো বাংলাদেশেই অনন্য। এছাড়াও পাশের জেলা পিরোজপুরের স্বরূপকাঠির (নেছারাবাদ) কুড়িয়ানা, আটঘর, আতা, ঝালকাঠির মাদ্রায় রয়েছে এমন হাট। আরো অবাক করা বিষয় হলো,
এসবই পিরোজপুর সন্ধ্যা নদী থেকে বয়ে আসা একই খালপাড়ে। দুপাশেই রয়েছে ব্যবসায়ীদের আড়ৎ।
তাই দক্ষিণাঞ্চলের হাট-বাজার আর বাগান এলাকা জুড়ে পাকা পেয়ারার মৌ-মৌ ঘ্রাণ চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। পাইকার এবং পেয়ারা চাষিদের বেচাকেনার ধুম পড়েছে পেয়ারার মোকাম (হাট-বাজার) গুলোতে। প্রায় ৩১ হাজার একর জমির উপর এ পেয়ারার রাজ্য।
তবে পেয়ারা এখানে প্রচুর উৎপাদন হলেও সংরক্ষণের অভাবে চাষিদের লোকসানের মুখে পড়তে হয় প্রতিবছরই। কারণ পেয়ারা দ্রুত পেকে যায়। তাই দ্রুত বিক্রি না করতে পারলে চাষিদের পড়তে হয় লোকসানের মুখে। সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগ থাকলে মৌসুমী এ ফল পেয়ারা বছর জুড়ে ভোক্তাদের চাহিদা মিটিয়ে চাষিরাও আর্থিকভাবে লাভবান হতো। কিন্তু দীর্ঘদিনেও উদ্যোক্তার অভাবে হিমাগারসহ প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে না উঠায় এবং উৎপাদন খরচ দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ায় চাষিরা পেয়ারা চাষাবাদে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
পেয়ারা চাষ ও ব্যবসাকে কেন্দ্র করে এসব এলাকায় গড়ে উঠেছে ২০টিরও বেশি ছোট-বড় মৌসুমী ব্যবসা কেন্দ্র। স্থানীয়ভাবে বলা হয় পেয়ারার মোকাম। প্রতিদিন সকালে এসব মোকামে চাষিরা ছোট ছোট ডিঙি নৌকায় সরাসরি বাগান থেকে পেয়ারা নিয়ে আসে পাইকারদের কাছে। তা কিনে ট্রলার যোগে নৌ পথে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ঢাকা চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়।
কাঁচাবালিয়া গ্রামের পেয়ারা চাষি জাহিদ মিয়া জানান, খড়ার কারণে ফলন ভালো না হওয়ার ভয় ছিলো। উপরওয়ালা সহায় থাকায় পেয়ারার ফলন ভালই হয়েছে। এবার মৌসুমের শুরুতেই ২৫ থেকে ৩০ টাকা কেজি দরে প্রতি মন পেয়ারা ৮শ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে। কিন্তু
বর্তমানে পেয়ারার দাম কমে গেছে। প্রতি মণ একহাজার থেকে ১২শ টাকা দরে বিক্রি করতে পারছি।
এ ব্যাপারে ঝালকাঠির জগদীশপুর গ্রামের পেয়ারা চাষি বিমল মিস্ত্রি জানান, প্রতি বছর হিমাগারের অভাবে এসব এলাকার কয়েক কোটি টাকার পেয়ারা নষ্ট হয়ে যায়। কারণ পেয়ারা পচনশীল ফল। তাই দ্রুত পেকে যাওয়ায় তা সংরক্ষণ করে রাখার কোনো ব্যবস্থা নেই।
আড়তদার লিটন হালদার বলেন, মৌসুমে প্রতিদিন প্রায় ১০ হাজার মন পেয়ারা বিক্রি হয়। ভিমরুলী মোকাম থেকে সড়ক ও নৌ পথে খুলনা, ফেনী, ঢাকা, সিলেট, পটুয়াখালী, ভোলা, মাদারীপুর, নাটোর, বরিশালে হাজার হাজার মন পেয়ারা যাচ্ছে। এর সঙ্গে এলাকার প্রায় ৭ থেকে ৮ হাজার শ্রমজীবী মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত।
পেয়ারা চাষি বিশ্বজিৎ চৌধুরী জানান, সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে বড় সাইজের পেয়ারা প্রসেসিং করে বিদেশে রফতানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। হেক্টর প্রতি ৫ থেকে ৬ টন উৎপাদিত পেয়ারা থেকে বছরে প্রায় আড়াই থেকে তিন কোটি টাকা আয় হয়।
এদিকে প্রতিবছর পেয়ারার মৌসুমে বিভিন্ন স্থান থেকে নৌ পথে পেয়ারা বাগানে আসে পর্যটকরা। পেয়ারা বাগানে এসে দেখে মুগ্ধ হয়ে এখান থেকে পেয়ারা কিনেও নিচ্ছেন পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনদের জন্য। এছাড়া শত শত বিদেশিও পর্যটক এখানে আসেন।
ভীমরুলীর ভাসমান এ পেয়ারা হাট দেখতে আসা পর্যটক মো. ফারুক খান বলেন, অদ্ভুত সুন্দর ভাসমান এ হাট ও তার আশপাশের প্রকৃতি যে কতটা নজরকাড়া হতে পারে, এটি এখানে না এলে বোঝার উপায় নেই।
ঝালকাঠি জেলা প্রসাশক আশরাফুর রহমান জানান, সংরক্ষণসহ কৃষি ভিত্তিক শিল্প-কারখানা গড়ে উঠলে চাষিরা আর্থিকভাবে লাভবান হতো। যুগ যুগ ধরে পেয়ারা চাষাবাদ করে আসলেও উদ্যোক্তার অভাবে হিমাগারসহ প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে না ওঠায় দিন দিন চাষাবাদে আগ্রহ হারাচ্ছেন পেয়ারা চাষিরা।
Leave a Reply