বগুড়াপোস্ট ডেস্ক
দক্ষিণ এশিয়ার শান্তিপ্রিয় পাহাড়ি রাষ্ট্র নেপাল বর্তমানে ভয়াবহ রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলির পদত্যাগ, অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে তরুণ প্রজন্মের গণবিক্ষোভ দেশটিকে এক অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে ঠেলে দিয়েছে। সহিংস বিক্ষোভে এরই মধ্যে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১৯ জন, আহত হয়েছেন শত শত মানুষ। মঙ্গলবার ভোরে আরো দুজন নিহত হওয়ার খবর মেলে। বিক্ষোভকারীরা শুধু রাজধানী কাঠমান্ডুই নয়, ভক্তপুর, বালকোটসহ বিভিন্ন এলাকায় সরকার ও রাজনৈতিক নেতাদের বাড়িঘরে হামলা চালিয়েছে। এই সংকট সরাসরি প্রভাব ফেলেছে সেখানে অবস্থানরত বিদেশিদের ওপর। বিশেষ করে বাংলাদেশি নাগরিকরা এখন কার্যত নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছেন। কাঠমান্ডুর বাংলাদেশ দূতাবাস জরুরি সতর্কতা জারি করে নেপালে অবস্থানরত নাগরিকদের ঘরে থাকার নির্দেশ দিয়েছে।
অলি সরকারের পতন ও আন্দোলনের শেকড়:
নেপালের বর্তমান সংকটের সূচনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ আরোপ থেকে। নতুন আইনের আওতায় ২৬টি সামাজিক মাধ্যমকে নিবন্ধনের নির্দেশ দেয় সরকার। কিন্তু এই নির্দেশের পরই একে একে জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলো বন্ধ হয়ে যায়। তথ্যপ্রবাহের স্বাধীনতা হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ক্ষুব্ধ হয় তরুণ সমাজ। বিশেষ করে জেনারেশন-জেড নামে পরিচিত নতুন প্রজন্ম রাজধানীর রাজপথে নেমে আসে।
এদিকে দীর্ঘদিন ধরে চলা দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতার অভিযোগও তরুণদের ক্ষোভকে উস্কে দেয়। মাত্র একদিনের ব্যবধানে আন্দোলন ভয়াবহ সহিংসতায় রূপ নেয়। সোমবার নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারান ১৯ জন বিক্ষোভকারী। শত শত মানুষ আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। এর মধ্যেই বিক্ষোভকারীরা ভক্তপুরের বালকোট এলাকায় অলি-নিবাসে হামলা চালায় ও আগুন ধরিয়ে দেয়। একইভাবে মন্ত্রিসভার সদস্য, সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের বাড়িতেও হামলা চলে।
পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে সেনাবাহিনীকে হেলিকপ্টারে করে মন্ত্রীদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে হয়। অবশেষে চরম চাপের মুখে মঙ্গলবার পদত্যাগ করেন প্রধানমন্ত্রী অলি। কিন্তু তাতেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। বরং বিক্ষোভকারীরা কারফিউ উপেক্ষা করে রাস্তায় নেমে আসেন।
বাংলাদেশের উদ্বেগ ও তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ:
নেপালে চলমান এই অস্থিরতা বাংলাদেশকেও উদ্বিগ্ন করেছে। মঙ্গলবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, ‘আমরা পরিস্থিতির ওপর নিবিড় দৃষ্টি রাখছি এবং কাঠমান্ডুর হাইকমিশনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ হচ্ছে।’ এরই মধ্যে নাগরিকদের ভ্রমণ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের জাতীয় ফুটবল দলের সদস্যদের নিয়ে। তাদের মঙ্গলবার দেশে ফেরার কথা ছিল, কিন্তু বিমানবন্দর বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা কাঠমান্ডুতেই আটকা পড়েছেন। একই পরিস্থিতিতে রয়েছেন ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজের (ডিএসসিএসসি) ৫১ সদস্যের প্রতিনিধি দল। তারা শিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিতে নেপালে অবস্থান করছিলেন। এখন সবাই কার্যত নিরাপত্তাহীন অবস্থায় আছেন।
দূতাবাসের সতর্কতা ও জরুরি যোগাযোগ:
বাংলাদেশ দূতাবাস এক জরুরি বার্তায় জানায়, নেপালে অবস্থানরত সকল বাংলাদেশি নাগরিককে ঘরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ভ্রমণ না করা এবং নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এছাড়া জরুরি প্রয়োজনে যোগাযোগের জন্য দুটি হটলাইন চালু করা হয়েছে—সাদেক (+৯৭৭ ৯৮০৩৮৭২৭৫৯) এবং সরদা (+৯৭৭ ৯৮৫১১২৮৩৮১)।
এ ধরনের দ্রুত পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে দূতাবাসের ভূমিকা আরো জোরদার করা জরুরি। কারণ, সংকট দীর্ঘায়িত হলে আটকে পড়া বাংলাদেশিদের দেশে ফিরিয়ে আনা বা নিরাপদ আশ্রয়ে স্থানান্তর করার উদ্যোগ নিতে হবে।
বাংলাদেশিদের জন্য করণীয়:
বর্তমান পরিস্থিতিতে নেপালে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের জন্য সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো নিরাপদ থাকা। এজন্য কয়েকটি নির্দেশনা অনুসরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—
যতটা সম্ভব ঘরের ভেতরে অবস্থান করা।
অতি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের না হওয়া।
দূতাবাসের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা এবং হটলাইন নম্বর সংরক্ষণ করা।
কারফিউ ভঙ্গ বা বিক্ষোভে অংশ নেয়া থেকে বিরত থাকা।
পরিস্থিতি আরো অবনত হলে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়া।
বাংলাদেশ সরকারেরও উচিত জরুরি ভিত্তিতে একটি উদ্ধার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া। বিমানবন্দর খোলার সঙ্গে সঙ্গেই আটকে পড়া বাংলাদেশিদের দেশে ফিরিয়ে আনা উচিত। একইসঙ্গে সেখানকার নাগরিকদের আর্থিক ও স্বাস্থ্যগত সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
নেপালের সংকট থেকে শিক্ষা:
নেপালের এই পরিস্থিতি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোর জন্যও সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করছে। রাষ্ট্র পরিচালনায় দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও স্বচ্ছতার অভাব জনগণের আস্থা নষ্ট করে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম যখন বঞ্চিত বোধ করে, তখন ক্ষোভ দ্রুতই রাজপথে বিস্ফোরিত হয়।
বাংলাদেশের জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। আমাদের দেশেও তরুণ প্রজন্ম ক্রমেই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। তাদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হলে বা সুযোগের অভাব তৈরি হলে ক্ষোভ জমতে পারে। সেই ক্ষোভ এক সময় ভয়াবহ অস্থিরতায় রূপ নিতে পারে—যেমনটি নেপালে হয়েছে। তাই বাংলাদেশকে এখন থেকেই স্বচ্ছ শাসনব্যবস্থা, দুর্নীতির লাগাম টানা এবং তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা পূরণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
Leave a Reply