বগুড়ায় মা না থাকায় ৩ বছরের ছেলেকে সাথে নিয়ে বাবা জীবিকার তাগিদে অটোরিকশা চালাচ্ছেন। সোমবার দুপুরে শহরের সাতমাথা এলাকায় এক অটোরিকশায় চালকের আসনে বসা বাবার কোছার মধ্যে ৩ বছরের শিশুকে বসে থাকতে দেখা যায়। এমন অবস্থায় বাবা ছেলে দুজনেই ঝুঁকিপুর্ণ অবস্থায় অটোরিকশা চালাচ্ছেন।
চালক বাবা জেলার সোনাতলা উপজেলার পাকুল্যার মিলনের পাড়া গ্রামের মাস্টার্স পাশ করা ইয়াসিন আলী(৪২)। সন্তানকে দেখাশোনা করার কেউ না থাকায় শিশুকে নিয়েই অটোরিকশা চালাতে আসেন। আহা রহস্যময় অটোরিকশার তিন চাকায় শিশু সন্তান ও তার বাবার সংগ্রমী জীবনচক্র।
শিশু সন্তানকে কোছায় নিয়ে অটোরিকশা চালক ইয়াসিনের সাথে আলাপ করার জন্য সোমবার দুপুরে তার যানবাহনে যাত্রী হয়ে উঠি। ইয়াসিন আলীর শিশু সন্তানটি কখনো তার বাবার কোছায় বসে আবার দাড়িয়ে থাকে। এমন দৃশ্য দেখে মর্মাহত হয়ে পড়ি। এরপর গন্তব্যস্থলের পথিমধ্যে চালক ইয়াসিন আলীকে জিজ্ঞেস করি কেন তিন বছরের শিশু ছেলে নিয়ে অটোরিকশা চালান। এমন জিজ্ঞেস করা মাত্রই ইয়াসিন আলী বলেন, এসব কথা বলেন না। এ এক চরম দুঃখের কাহিনী।
একপর্যায়ে অটোচালক ইয়াসিন আলী জানান, ২০১২ সালে মাস্টার্স পাশ করেছেন বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজ থেকে। এরপর অনেক চাকরির জন্য পরীক্ষা দিয়ে ফলাফল ভালো হয় না। তাই ভালো কোন চাকরি না পাওয়ায় গামেন্টস চাকরি করি। এরপর ২০১৮ সালের মাস্টার্স পাশের এক মেয়েকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর ঢাকায় দুইজনই অবশেষে গার্মেন্টসে চাকরি করে ভালোভাবেই জীবিকা নির্বাহ করে আসছিলেন।
ইয়াসিন আলীর সাথে এসব আলাপচারিতার পর
জিজ্ঞেস করলাম আপনার সাথে ওই শিশু ছেলে কার? তিনি বলেন শিশু সন্তানটি তার। তাদের দাম্পত্য জীবনে ২০২২ সালের মধ্যে সময়ে এই ছেলে সন্তানটি জন্মগ্রহন করে। এরপর গত বছর জুন মাসে তাঁর স্ত্রীর দ্বিতীয় সন্তানের ৭ মাসের প্রেগন্যান্সির সময় বগুড়া শহরের মাটিডালির এক ক্লিনিকে নার্সের দেওয়া ভুল ইনজেকশনে তাঁর স্ত্রী মারা গেছেন। তখন এই বাচ্চার বয়স দু বছর তিন মাস। স্ত্রীকে বাঁচানোর জন্য সর্বাত্তক চেস্টা করতে গিয়ে আর্থিক ধার দেনা করে ফেলেন। এরপর তার জীবন হয়ে উঠে বিবি শিখাময়। কি করবেন তা ভেবে পাচ্ছিলেন না।
কিছুদিন পর স্ত্রী হারানোর বেদনা কিছুটা কম গেলে তিনি সিদ্ধান্ত নেন কিছু একটা করার। এই সিদ্ধান্ত থেকে বাড়ি ভিটা কিছু জমি বিক্রি করে ধার দেনা পরিশোধ করেন। এরপর ১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা দিয়ে অটোরিকশা কিনেন ইয়াসিন আলী। এদিকে শিশু ছেলে সন্তানটি একটু বড় হয়ে যায়। কিন্তু ইয়াসিন আলী বাবা মা এবং কাছের আত্মীয় কেউ না থাকায় ছেলে সন্তানকে কারো কাছে রাখতে পারেন না। সেইজন্য
অটোরিকশা কিনার পর শিশু সন্তানকে নিয়ে নিজ এলাকায় যানটি চালাতেন। কিন্তু এলাকায় ভাড়া ভালো না হওয়ায় এখন প্রায় প্রতিদিনই বগুড়া শহরে অটোরিকশা চালাচ্ছেন। সন্তানকে কারো কাছে রাখার জন্য টাকা পয়সা দিতে চেয়েছি,কিন্তু দায়িত্ববান কাউকে পাননি। তাই এত ছোট্ট শিশুকে নিয়েই অটোরিকশা চালাতে বের হতে হয়। শিশুকে অটোরিকশা চালাতে সমস্যা হয়। শিশু কখনো কোছায় বসে, আবার দাড়িয়ে যায়,কখনো দোল খায়,আবার কখনো ঘুমিয়ে যায়। তারপরও কিছুই করার নেই,তাই সন্তানকে সাথে নিয়েই অটোরিকশা চালান।
ইয়াসিন আলী ছেলের দিকে তাকিয়ে আর দ্বিতীয় বিবাহ করেন নাই। সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে তিনি ভবিষ্যতেও বিবাহ করবেন না বলে জানান। সব মিলিয়ে এ যেন মায়া শিশু সন্তান ও বাবার দুর্রবিসহ রহস্যময় জীবনচক্র।
Leave a Reply