নিজস্ব প্রতিবেদক
বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার আড়িয়া ইউনিয়নের শালুকগাড়ি গ্রামে ঘটে গেছে এক হৃদয়বিদারক ঘটনা। পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব ও শ্রদ্ধাবোধ যখন সমাজের অন্যতম মৌলিক মূল্যবোধ হওয়া উচিত, তখন সেই সম্পর্কই ভেঙে পড়েছে সম্পত্তির লোভে। রবিবার (১২ অক্টোবর) সম্পত্তি নিয়ে পারিবারিক বিরোধের জেরে একজন ছেলে নিজের পিতার লাশ দাফনে বাধা দিয়ে এক অমানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন হামেদ আলী (৫৮)। জীবদ্দশায় তিনি পরিবারে শান্তি বজায় রাখতে চেয়েছিলেন। হয়তো সেই ভাবনা থেকেই মৃত্যুর আগে স্ত্রী ও দুই মেয়ের নামে বাড়ি ও জমিসহ সমস্ত সম্পত্তি লিখে দেন। কিন্তু এই সিদ্ধান্তেই যেন শুরু হয় এক নতুন কলহের অধ্যায়। একমাত্র ছেলে মাসুদ রানা (৩০) বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি। উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার ক্ষোভে তিনি পিতার জানাজা ও দাফনে বাধা দেন, দাবি করেন তাঁর ‘ন্যায্য’ সম্পত্তির অংশ।
লাশ তখন ঘরে পড়ে আছে, সময় গড়িয়ে যাচ্ছে। গ্রামের মানুষ হতবাক। কেউ বিশ্বাস করতে পারছিল না, একজন ছেলে পিতার লাশ আটকে রেখে সম্পত্তি আদায়ের চেষ্টা করছে! মানবতার এই করুণ চিত্রে গ্রামজুড়ে নেমে আসে নিন্দার ঝড়।
অবশেষে খবর পেয়ে স্থানীয় চেয়ারম্যান আতিকুর রহমান আতিক, ইউপি সদস্য ও আত্মীয়স্বজনরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। দীর্ঘ আলোচনা ও মধ্যস্থতার পর ইসলামি ফারায়েজ আইনের ভিত্তিতে সম্পত্তি বণ্টনের সিদ্ধান্ত হয়। দলিল সম্পাদন শেষে অবশেষে জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হয়—মৃত্যুর প্রায় ২০ ঘণ্টা পর।
এ ঘটনাকে স্থানীয়রা পারিবারিক মূল্যবোধের ভয়াবহ অবক্ষয়ের প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখছেন। একসময় সমাজে পিতা-মাতা ছিলেন সর্বোচ্চ শ্রদ্ধার আসনে। তাঁদের কথা ছিল আইন, তাঁদের ইচ্ছাই ছিল সন্তানের কাছে পরম নির্দেশ। কিন্তু আজ সেই সম্পর্ক যেন ক্রমেই ভঙ্গুর হয়ে পড়ছে। সম্পত্তির লোভ, পারিবারিক অশান্তি, আধুনিকতার মোড়কে গাঁথা স্বার্থপরতার সংস্কৃতি—সব মিলিয়ে মানবিক সম্পর্কের উষ্ণতা হারিয়ে যাচ্ছে।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার অভাব। ইসলাম শিক্ষা দেয়—পিতা-মাতার সেবা ও আনুগত্যই আল্লাহর সন্তুষ্টির পথ। কুরআনে বারবার বলা হয়েছে, “তোমরা পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করো।” অথচ আজ সেই পিতার দাফনে বাধা দেওয়ার মতো ঘটনা সমাজে আলোচনার জন্ম দিচ্ছে।
শালুকগাড়ির এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের নয়, এটি গোটা সমাজের জন্য এক সতর্কবার্তা। আমাদের পারিবারিক বন্ধন, নৈতিক মূল্যবোধ ও ধর্মীয় চেতনা কতটা ক্ষয়ে গেছে, তারই প্রতিফলন এই ঘটনার মধ্যে স্পষ্ট।
এখন সময় এসেছে আত্মসমালোচনার। পরিবারকে শুধু অর্থ বা সম্পত্তির ভিত্তিতে নয়, ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ ও ধর্মীয় নীতিতে গড়ে তোলার। নয়তো এমন অমানবিক ঘটনা ভবিষ্যতে আরও বাড়বে, আর সমাজ হারাবে তার মানবিক মুখচ্ছবি।
caller_get_posts is deprecated. Use ignore_sticky_posts instead. in /home/bogurapo/public_html/wp-includes/functions.php on line 6260caller_get_posts is deprecated. Use ignore_sticky_posts instead. in /home/bogurapo/public_html/wp-includes/functions.php on line 6260
Leave a Reply