বগুড়াপোস্ট ডেস্ক
জুলাই আন্দোলনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার থেকে কোনো ইঙ্গিত কিংবা বার্তা সম্পর্কে অবগত নয়। যদি এ সংক্রান্ত কোনো উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়ে থাকে, তবে তা তৎকালীন বাংলাদেশ সরকারকে জানানো হয়ে থাকতে পারে, সেনাবাহিনীকে নয়।
সোমবার এক বিবৃতিতে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতর (আইএসপিআর) এসব তথ্য জানিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি মনে করে- অধিকতর সঠিকতা ও স্বচ্ছতার উদ্দেশ্যে কিছু বিষয়ে স্পষ্টিকরণ প্রয়োজন।
বিবৃতিতে বলা হয়, সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের সমসাময়িক বিষয় নিয়ে সাক্ষাৎকারভিত্তিক অনুষ্ঠান ‘হার্ডটক’-এ জুলাই আন্দোলনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভূমিকা সম্পর্কে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্কের মন্তব্য নিয়ে একটি সংবাদ প্রচার করা হয়।
আইএসপিআর জানায়, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী মানবাধিকারের তাৎপর্য যথাযথভাবে মূল্যায়ন করে এবং যেকোনো গঠনমূলক সমালোচনা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে, তবে অধিকতর সঠিকতা ও স্বচ্ছতার উদ্দেশ্যে উক্ত মন্তব্যের কিছু বিষয়ে স্পষ্টিকরণ প্রয়োজন বলে মনে করে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জাতীয় নিরাপত্তা নির্দেশিকা অনুযায়ী কাজ করে এবং সর্বদা আইনের শাসন ও মানবাধিকার নীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তবে, ভলকার তুর্কের মন্তব্য কিছু মহলের মাধ্যমে ভুলভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে, যা সেনাবাহিনীর ভূমিকা সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা সৃষ্টি এবং এর পেশাদারিত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।
নিরপেক্ষতা ও সততার মহান ঐতিহ্য ধারণ করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সর্বদা জনগণের পাশে থাকতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। অতীতের ঘটনাপ্রবাহ, বিশেষত ১৯৯১ সালের গণতান্ত্রিক রূপান্তর প্রমাণ করে যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কখনো জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করেনি। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের সময়ও সেনাবাহিনী জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছে এবং কোনো পক্ষপাত বা বাহ্যিক প্রভাব ছাড়াই জননিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। প্রসঙ্গত, বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ হিসেবে, পেশাদারিত্ব ও নিষ্ঠার জন্য বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত।
এখানে উল্লেখ্য যে, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অর্জিত আয়ের একটি ক্ষুদ্র অংশ শান্তিরক্ষীরা পেয়ে থাকেন এবং এর সিংহভাগ জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে, যার পরিমাণ গত ২৩ বছরে প্রায় ২৭০০০ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক কমিশনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সুসম্পর্ককে গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করে এবং দেশের জনগণ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি দায়িত্ব পালনে সর্বদা অঙ্গীকারবদ্ধ। সেনাবাহিনীর ভূমিকা সংক্রান্ত যেকোনো বিষয়ে উদ্বেগ অথবা বিভ্রান্তি সৃষ্টি হলে তা গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে ফলপ্রসূভাবে সমাধান করা সম্ভব বলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী মনে করে।
এদিকে, মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্কের ঐ মন্তব্যের পর থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানকে নিয়ে কয়েকটি স্বার্থান্বেষী মহল সেনাবাহিনীর সেই সময়ের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। কিন্তু জুলাই আন্দোলনে ঢাকা সেনানিবাসসহ ভিটিসি’র মাধ্যমে অন্যান্য সকল সেনানিবাসের অফিসারদের উদ্দেশে রাখা বক্তব্যে সেনাপ্রধান আত্মরক্ষা ব্যতীত ছাত্র-জনতার আন্দোলন প্রতিহত করার জন্যে গুলি না করার স্পষ্ট নির্দেশ প্রদান করেন। সেনাপ্রধান নিজেই যখন ছাত্রজনতার আন্দোলন প্রতিহত না করার সিদ্ধান্ত প্রদান করেন, তখন জাতিসংঘের সতর্কবার্তাকে সামনে এনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টির কোনো সুযোগ নেই।
২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে জেনারেল ওয়াকার আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ওপর গুলির নির্দেশ না দিয়ে জনআকাঙ্ক্ষার প্রতি সম্মান দেখিয়েছেন এবং জনতার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। স্বৈরাচারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে দেশের জনমানুষের স্বার্থকে সবার আগে প্রাধান্য দিয়েছিলেন তিনি— যা ছিল ইতিহাস বদলে দেওয়া এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত।
৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ঢাকার রাজপথে ছাত্র-জনতা যেভাবে সেনাবাহিনীর সদস্যদের প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান দেখিয়েছে, তা ছিল অভূতপূর্ব এবং নজিরবিহীন।
এরপর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও ক্ষমতার পট পরিবর্তন ঘটে। সেখানেও দেশবাসীকে সাহস জুগিয়েছে সেনাবাহিনী। ডাকাতিসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, সাম্প্রদায়িক উসকানি ও সহিংসতা মোকাবিলায় নিরপেক্ষভাবে কাজ করেছে দেশপ্রেমিক সেনাসদস্যরা। এখনো এই বীর সেনারা জনগণের পাশে রয়েছে বলেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে, স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে দেশে।
Leave a Reply