আলমগীর হোসেন
শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কারের আন্দোলন চলাকালে ঢাকার সাভারে পুলিশের গুলিতে গত শনিবার(২০ জুলাই) মারা যান রিকশাচালক বগুড়ার রনি প্রামাণিক (২৫) । নিহত রনির বাড়ি বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার পঞ্চদাস গ্রামের স্বজনদের শোকের মাতামে এলাকার আকাশ বাতাস ভারি হয়ে আছে। নিহত রনির দুই শিশু সন্তান কাঁদছে আর বাবাকে খুজছে, স্ত্রী তার স্বামীকে এবং একমাত্র মা তার সন্তানকে হারিয়ে চরম অসহায়ত্ব বোধ করছে । নিহত রনি উপজেলার বুড়িগঞ্জ ইউনিয়নের পঞ্চদাস লোলখুর গ্রামের মৃত দিলবর প্রামাণিকের ছেলে।
জানা যায়, শিবগঞ্জ বুড়িগঞ্জ ইউনিয়নের পঞ্চদাস লোলখুর গ্রামের পুকুরপাড়ের ভুমিহীন মৃত দিলবর প্রামাণিকের ছেলে রণি প্রামানিক জীবন জীবিকার জন্য রিকশা চালানোর জন্য ঢাকার সাভারে যান। স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে সাভার বাসষ্ট্যান্ড এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস করে আসছিলেন নিহত রনি। গত শনিবার রণির শরীর খারাপ থাকার কারণে ৯টায় গ্যারেজ থেকে রিকশা নিয়ে বের হয়। এরপর বেলা ১১টার সাভার বাসষ্ট্যান্ডে যাত্রীর জন্য অপেক্ষা করতেই হঠাৎ আন্দোলনকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশের ছোড়া গুলিবিদ্ধ হয় রিকশা চালক রণি। স্থায়ীরা তাকে উদ্ধার করে এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। সেই নিহত রনি প্রামানিককের মরদেহ বগুড়ায় গ্রামের বাড়িতে আসে রোববার সকালে। সেখানে ছেলের মরদেহ দেখে রনির বিধবা মা শাহানা খাতুন অজ্ঞাত হয়ে যায়। নিহত রণির দুই শিশু সন্তান শুধু বাবাকে খুঁজে ফিরছে ছোট্ট দুটি চোখ। সে জানে না, তার বাবা আর কখনও ফিরবে না। দেড় বছর বয়সী ইভানের কান্না দেখে প্রতিবশীরাও চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। স্ত্রী সাথী বেগম দুই শিশুসন্তান নিয়ে দিশেহারা। রনি প্রামানিক ও সাথী বেগমের দম্পতির বড় ছেলে ইয়াসিনের বয়স পাঁচ বছর ও ছোট ছেলে ইভানের বয়স দেড় বছর।
পঞ্চদাস গ্রামের বাসিন্দা আজিজার রহমান জানান, গত রোববার ভোরে সন্তানসহ স্বামীর মরদেহ নিয়ে সাথী বেগম গ্রামের বাড়িতে বগুড়া আসেন। বাদ জোহর জানাজা শেষে স্থানীয়ভাবে তাঁর মরদেহ দাফন করা হয়। রনির দিনমজুর বাবা ৪ বছর আগে মারা গেছেন। মা শাহানা খাতুন খাস জমিতে ঝুপড়ি ঘর তুলে বসবাস করছেন। মানুষের দান-দক্ষিণায় চলে তাঁর জীবিকা।
সরেজমিন দেখা যায়, সন্তানের মরদেহের পাশে বসে রনির মা শাহানা খাতুন বিলাপ করছেন আর বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। জ্ঞান ফিরতেই বলেন, ‘হ্যামার বুকের ধন ছোলক পাখির মতোন গুলি কর্যার মারছে। হামি এখন কী নিয়া ক্যানকা করে বাঁচমু।
এ সময় রনির স্ত্রী সাথী বেগম জানান, ছোট ছেলে জ্বরে ভুগছিল। ওর বাবার শরীরও ভালো যাচ্ছিল না। কিন্তু গত দুদিন রিকশা বন্ধ থাকায় ঘরে চাল-ডাল ছিল না।সন্তানের জন্য ওষুধ কেনাও দরকার। এ জন্য শনিবার সকাল ৯টার দিকে গ্যারেজ মহাজনের কাছ থেকে রিকশা নিয়ে বের হয়। দুপুর ১২টার দিকে এক প্রতিবেশী ফোন করে জানান, তোমার স্বামীর বুকে গুলি লেগেছে, এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আছে। সঙ্গে সঙ্গে ইভানকে কোলে নিয়ে হাসপাতালে গিয়ে স্বামীর নিথর দেহ পড়ে থাকতে পাই। তাঁর বুকেপিঠে অসংখ্য গুলির চিহ্ন।
তিনি বলেন, আমার স্বামী তো আন্দোলন করেনি। তার পরও তাঁকে জীবন দিতে হলো। ছেলেরা বাবা বাবা বলে হয়রানি হচ্ছে। ইভান বাবার জন্য পাগল ছিল। ওকে থামাতে পারছি না। শুধুই বাবাকে খুঁজছে, বুকের দুধও খাচ্ছে না। আমি অবুঝ সন্তানদের কী বুঝ দেব, এক বেলা খাওয়ার মতো ঘরে চাল-ডালও নেই। ওদের কীভাবে বড় করব, বুঝে উঠতে পারছি না।
নিহতের মা শাহানা খাতুন জানান, আমার বেচে থাকার কোন কিছু নেই। একমাত্র নিরিহ সন্তানকে অন্যায়ভাবে মেরে ফেলল। এখন আমি কাকে নিয়ে বাচব। কার আশায় থাকব। আমার ছেলের শিশু সন্তানদের কি হবে, কেমন করে কি খাওয়াব, কি করে তারা বাচবে।
স্থানীয় বুড়িগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম চঞ্চল জানান, মরদেহ গ্রামের আসার পর তার বাড়িতে গিয়ে সান্তনা দিয়ে এসেছি। রনি পরিবারকে সাধ্য মতো সহায়তা করা চেস্টা করব ইউনিয়ন পরিষদ থেকে। তবে অসহায় পরিবারটির দায়িত্ব সরকার নিলে স্ত্রী দুই ছেলে নিয়ে বেঁচে থাকার পথ পাবেন । রনি পরিবারের পাশে সরকারের দাঁড়ানো উচিত ।
caller_get_posts is deprecated. Use ignore_sticky_posts instead. in /home/bogurapo/public_html/wp-includes/functions.php on line 6260caller_get_posts is deprecated. Use ignore_sticky_posts instead. in /home/bogurapo/public_html/wp-includes/functions.php on line 6260
Leave a Reply