আলহাজ্ব মোঃ আনোয়ার হোসেন মতিন
সম্পত্তির দলিল লেখার জন্য ‘দলিল লেখক’ এর কাছে দায়িত্ব দিয়েই ক্রেতার দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। কেননা পরবর্তীতে দলিলে ভুল পরিলক্ষিত হলে দলিল লেখক নয় এর মাশুল গুনতে হবে ক্রেতাকেই। তাই দলিল রেজিস্ট্রেশন এর পূর্বেই ক্রেতার সচেতনতা আবশ্যক। সম্পত্তির দলিল লেখার ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত বিষয়ে ক্রেতা ও দলিল লেখকের লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন:
১। দলিল সম্পাদনকারী তথা জমি দাতা (বিক্রেতা) আইনের দৃষ্টিতে সাবালক ও সুস্থ মস্তিষ্ক সম্পন্ন কি না, আদালত কর্তৃক দেউলিয়া ঘোষিত কি না তা যাচাই করে নিতে হবে৷
২। দলিলের ধরন যেমন- (ক) সাফ কবলা (খ) বায়না পত্র (গ) দানপত্র (ঘ) হেবার ঘোষনাপত্র ইত্যাদি সকল দলিলের প্রকৃতি খেয়াল করতে হবে৷
৩। ক্রেতা যে জমিটি কিনতে যাচ্ছেন সেই প্রস্তাবিত জমির পরিমাণ, বিক্রয় মূল্য (বায়না দলিল হলে বায়নায় পরিশোধিত টাকা এবং বাকী টাকা) ইত্যাদি দেখে নিতে হবে।
৪। পক্ষ পরিচয় তথ্য যেমন- দলিল গ্রহীতা/প্রথম পক্ষ, দলিল দাতা/দ্বিতীয় পক্ষ, উভয় পক্ষের পূর্ণ নাম, ঠিকানা, পেশা, ধর্ম ইত্যাদি। দলিল গ্রহীতার ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্র এবং দাতার ক্ষেত্রে আগত খতিয়ান (সর্বশেষ জরিপ/নামজারি খতিয়ান) এর সাথে মিল রেখে নাম ঠিকানা লেখা হয়েছে কি না দেখতে হবে।
৫। স্বত্ত্বের বর্ণনা যেমন- জমি দাতার মালিকানার ভিত্তি, দলিল মূলে হলে পূর্বের দলিলের নম্বর ও তারিখ, পর্চা/খতিয়ান নম্বর ইত্যাদি৷
৬। জমির বিক্রেতা যদি জমিটি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়ে থাকে তাহলে মূল মালিকের সাথে বিক্রেতা যোগসূত্র/সম্পর্ক সঠিক আছে কিনা তা জেনে নিতে হবে৷
৭। দলিলে প্রস্তাবিত জমির তফশিল যেমন- জেলার নাম, উপজেলার নাম, রেজিস্ট্রি অফিসের নাম, মৌজার নাম, জেএল নম্বর, দাগ নম্বর, খতিয়ান নম্বর এবং জমির শ্রেণি আগত খতিয়ানের সাথে মিল আছে কি না দেখে নিতে হবে। জমির তফশিল লেখার সময় প্রত্যেক দাগে মোট জমির পরিমাণ কত এবং অত্র বিক্রয় দলিলে উক্ত দাগের মধ্যে কত একর বা শতাংশ জমি বিক্রয় করা হচ্ছে তা প্রতি ক্ষেত্রে লিখে নিতে হবে৷ তবে উল্লেখ্য যে, কোন অবস্থাতেই কয়েকটি দাগের জমি একত্রে যোগ করে একর/শতাংশ লেখা উচিত হবে না৷
৮। ক্রেতা যে জমিটি ক্রয় করতে চাচ্ছে সেই জমিটির চৌহদ্দি ঠিক আছে কি না অর্থাত্ উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম পাশের জমির বর্ণনা সহ মালিকের নাম উল্লেখ করতে হবে৷
৯। জমি বিক্রেতা বা দলিল দাতা দলিলের ১ম পৃষ্ঠার উপরের ডান পাশ্বের নীচ থেকে উপরের দিকে তার নিজ নাম স্বাক্ষর করবেন অথবা নিরক্ষর হলে নিজ নামের উপরে টিপ সহি প্রদান করেছেন কি না তা দেখতে হবে৷ এছাড়াও জমি বিক্রেতা বা দাতা দলিলের প্রতি পৃষ্ঠায় আড়া-আড়ি ভাবে এবং শেষ পৃষ্ঠার নীচে এবং প্রথম পৃষ্ঠার অপর পৃষ্ঠায় স্বাক্ষর বা টিপ সহি করবেন৷
১০। দলিলটির লেখক তার নাম স্বাক্ষর এবং কমপক্ষে ২ জন সাক্ষী এবং অপর একজন জমির বিক্রেতাকে সনাক্ত করে সনাক্তকারী হিসাবে স্বাক্ষর করবেন।
১১। দলিলে যতদূর সম্ভব কাটাকাটি, ঘষামাঝা, অষ্পষ্টতা এড়াতে হবে তবুও যদি কোনরূপ ভুল ক্রটি ঘষামাঝা কাটাকাটি হয়েও যায় তাহলে সেক্ষেত্রে উক্ত কাটাকাটি বা ঘষামাঝা যুক্ত লাইন ও শব্দের ক্রম উল্লেখ করে দলিলের শেষাংশে কৈফিয়ত লিখে দলিল লেখককে তার নীচে স্বাক্ষর করতে হবে৷ সেই ক্ষেত্রে কৈফিয়ত কলামে দাতার স্বাক্ষর করালে ভালো হবে।
এছাড়াও জমির ক্রেতাকে সহ দলিল লেখক কে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে- বিভিন্ন জরিপের দাগ নম্বর ও খতিয়ান নম্বর সঠিকভাবে লিখা হয়েছে কিনা। এজন্য জমির ক্রেতাকে জমি ক্রয় করার পূর্বেই তহসিল অফিস হতে জমির সঠিক দাগ নম্বর ও খতিয়ান নম্বর জেনে নিতে হবে৷ প্রয়োজনে খতিয়ান সহ সকল কাগজের সইমোহর নকল সংগ্রহ করতে হবে।
উল্লেখিত বিষয়গুলো দলিল রেজিস্ট্রেশন এর পূর্বে খেয়াল না করার কারণে দলিল ভুল হয় এবং তার জন্য জমি ক্রেতাকে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। তাই সকলকে উল্লেখিত বিষয়গুলো দলিল রেজিস্ট্রেশন এর পূর্বেই দেখে নেওয়া উচিৎ বলে আমি মনে করি।
সকল কে পোস্ট পড়ার জন্য ধন্যবাদ
************
আনোয়ার হোসেন মতিন
দলিল লেখক
বগুড়া সদর, বগুড়া।
caller_get_posts is deprecated. Use ignore_sticky_posts instead. in /home/bogurapo/public_html/wp-includes/functions.php on line 6260caller_get_posts is deprecated. Use ignore_sticky_posts instead. in /home/bogurapo/public_html/wp-includes/functions.php on line 6260
Leave a Reply